সাত থেকে বারো মাস শিশুর জীবনের সবচেয়ে দ্রুত বদলের সময়গুলোর একটি: নিজে বসা, হামাগুড়ি, দাঁড়ানো, প্রথম শব্দ আর পরিবারের খাবারের সাথে পরিচয়। এই সময়ে বুকের দুধের পাশাপাশি পরিপূরক খাবার ধাপে ধাপে বাড়াতে হয়, আর শিশু চলাফেরা শুরু করায় ঘরের নিরাপত্তা নতুন করে দেখতে হয়। মাইলস্টোনগুলো গড় হিসাব; প্রত্যেক শিশু নিজের গতিতে এগোয়, তবে নিচের সতর্ক সংকেতগুলো মনে রাখুন।
এক নজরে: ৭–১২ মাস
| মাস | বিকাশ (সাধারণত) | খাবার | ঘুম |
|---|---|---|---|
| ৭ মাস | সাপোর্ট ছাড়া বসতে শুরু, এক হাত থেকে অন্য হাতে নেওয়া | বুকের দুধ + দিনে ২–৩ বার নরম চটকানো খাবার | মোট ১২–১৬ ঘণ্টা, দিনে ২–৩টি ঘুম |
| ৮ মাস | গড়ানো, হামাগুড়ির চেষ্টা, "বা-বা" বাবল | ঘন খিচুড়ি, চটকানো ফল-সবজি | দিনে ২টি ঘুম |
| ৯ মাস | নিজে বসা, অপরিচিতে ভয়, কোলে উঠতে হাত বাড়ানো | দিনে ৩–৪ বার, ছোট নরম টুকরো | রাতে লম্বা ঘুম শুরু হতে পারে |
| ১০ মাস | কিছু ধরে দাঁড়ানো, বুড়ো আঙুল-তর্জনী দিয়ে তোলা | আঙুলে ধরে খাওয়ার নরম খাবার | দিনে ২টি ঘুম |
| ১১ মাস | আসবাব ধরে হাঁটা, "না" বোঝা | পরিবারের খাবার নরম করে, কাপে পানি | দিনে ২টি ঘুম |
| ১২ মাস | হাত নাড়া, "মা/বাবা" বলা, কেউ কেউ প্রথম পা ফেলে | পরিবারের খাবার, দিনে ৩–৪ বার + ১–২ নাস্তা | মোট ১১–১৪ ঘণ্টা |
মাসে মাসে কী দেখবেন
৭ মাস
শিশু সাপোর্ট ছাড়া কিছুক্ষণ বসতে শুরু করে, খেলনা এক হাত থেকে অন্য হাতে নেয়, আর নিজের নামে সাড়া দেয়। মেঝেতে খেলার সময় বাড়ান। দাঁত ওঠা শুরু হতে পারে; নরম সিলিকন টিদার মাড়িতে আরাম দেয়।
৮ মাস
গড়ানো ও হামাগুড়ির চেষ্টা শুরু হয়। "বা-বা", "দা-দা" জাতীয় বাবল বাড়ে। শিশুর শব্দের উত্তর দিন, ছবির বই দেখান। এখন থেকে মেঝের ছোট জিনিস, তার, চার্জার নাগালের বাইরে রাখুন।
৯ মাস
বেশিরভাগ শিশু নিজে বসতে পারে, বসা অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। অপরিচিত মানুষ দেখে ভয় বা কান্না এই সময় খুব স্বাভাবিক। লুকোচুরি খেলা ("টুকি") দারুণ উপভোগ করে। খাবারে ছোট নরম টুকরো যোগ করুন।
১০ মাস
আসবাব ধরে দাঁড়ানো, বুড়ো আঙুল ও তর্জনী দিয়ে ছোট জিনিস তোলা (পিনসার গ্রাস্প) শুরু হয়। আঙুলে ধরে খাওয়ার মতো নরম খাবার দিন, সবসময় পাশে বসে। সিঁড়ি ও জানালার গ্রিলের দিকে নজর দিন।
১১ মাস
আসবাব ধরে পাশে পাশে হাঁটে, "না" শব্দ বোঝে, সহজ নির্দেশ ("দাও") মানতে শুরু করে। কাপে পানি খাওয়ার অভ্যাস করান; স্পিল-প্রুফ সিপার কাজে দেয়।
১২ মাস
অনেক শিশু হাত নেড়ে বিদায় জানায়, "মা" বা "বাবা" অর্থ বুঝে বলে, কেউ কেউ প্রথম পা ফেলে। প্রথম জন্মদিনের দিকে শিশু পরিবারের খাবারের বেশিরভাগই খেতে পারে, নরম ও ছোট করে।
খাবার: বুকের দুধ আর পরিপূরক খাবার
WHO-এর পরামর্শ:
- বুকের দুধ চালিয়ে যান দুই বছর বা তার বেশি পর্যন্ত।
- ৬–৮ মাস: দিনে ২–৩ বার পরিপূরক খাবার।
- ৯–২৩ মাস: দিনে ৩–৪ বার খাবার, প্রয়োজনে ১–২ বার হালকা নাস্তা।
- ঘনত্ব: শুরুতে চটকানো, ধীরে ধীরে ছোট টুকরো, ১২ মাসে পরিবারের খাবার।
- বৈচিত্র্য: চাল-ডালের খিচুড়ির সাথে ডিম, মাছ, মুরগি, কলিজা (আয়রন), সবুজ ও হলুদ সবজি, মৌসুমি ফল।
এড়িয়ে চলুন: মধু (১ বছরের আগে), বাড়তি লবণ ও চিনি, চা, কোমল পানীয়, বাজারের মিষ্টি জুস, গোটা বাদাম, গোটা আঙুর, শক্ত টুকরো। গরুর দুধ মূল পানীয় হিসেবে ১ বছরের পর।
খাওয়ানোর সময়: সোজা করে বসান, ধৈর্য ধরে খাওয়ান, জোর করবেন না, স্ক্রিন বন্ধ রাখুন, আর হাত ধুয়ে খাবার বানান ও খাওয়ান। সিলিকন বিব ও নরম চামচে শিশু নিজে চেষ্টা করতে পারে।
ঘুম
এই বয়সে দিনের ঘুমসহ মোট প্রায় ১২–১৬ ঘণ্টা ঘুম সাধারণ, সাধারণত দিনে ২টি ঘুম। প্রতিদিন একই রুটিন (গোসল, খাওয়ানো, গান, ঘুম) রাখুন। নিরাপদ ঘুমের নিয়ম মেনে চলুন: চিত করে, সমতল ও শক্ত বিছানায়, বালিশ-কম্বল-খেলনা ছাড়া। হামাগুড়ি ও দাঁড়ানোর নতুন দক্ষতার কারণে কিছুদিন রাতে বেশি জাগতে পারে; এটা সাময়িক।
নিরাপত্তা চেকলিস্ট
- মেঝের ছোট জিনিস, কয়েন, বোতাম, ব্যাটারি, ওষুধ নাগালের বাইরে
- বালতি ও পানির পাত্র খালি রাখা বা ঢেকে রাখা; ডোবার জন্য কয়েক সেন্টিমিটার পানিই যথেষ্ট
- সকেটে কভার, তার গুছিয়ে রাখা
- গরম চা, ভাতের হাঁড়ি, ইস্ত্রি টেবিলের কিনারা থেকে দূরে
- সিঁড়িতে গেট, জানালার গ্রিল পরীক্ষা
- খাট বা সোফায় শিশুকে একা রাখবেন না; পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি
টিকা
সরকারি ইপিআই সূচি অনুযায়ী এই সময়ে (সাধারণত ৯ মাসে) হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। শিশুর টিকা কার্ড দেখে তারিখ মিলিয়ে নিন এবং কোনো ডোজ বাদ পড়লে কাছের টিকা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশের পরিবারে বাস্তবতা
অনেক পরিবারে সাত-আট মাসেও শুধু সুজি বা পাতলা খিচুড়ি দেওয়া হয়; ধীরে ধীরে ঘন করে ডিম, মাছ, সবজি যোগ করুন। দাদি-নানিরা মধু বা চিনি-পানি দিতে চাইতে পারেন; এক বছরের আগে মধু নয়, এটা বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলুন। গরমে শিশুকে বাড়তি পানি বা বুকের দুধ দিন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
- ৯ মাসে সাপোর্ট দিয়েও বসতে না পারা
- নাম ধরে ডাকলে বা শব্দে সাড়া না দেওয়া
- ১২ মাসে বাবল, হাত নাড়া বা আঙুল দিয়ে দেখানো না করা
- ওজন না বাড়া বা কমে যাওয়া, খাবারে বারবার বমি
- শরীরের এক পাশ কম ব্যবহার করা
- আগে পারা কোনো দক্ষতা হারিয়ে যাওয়া
- জ্বর, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা (প্রস্রাব কমে যাওয়া), খিঁচুনি: জরুরি
