শীতে শিশুকে গরম রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় একটি মোটা পোশাক নয়, কয়েকটি পাতলা স্তর, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী খোলা বা যোগ করা যায়। সহজ নিয়ম: একই ঘরে বা আবহাওয়ায় বড়রা যতটা পরেন, শিশুকে তার চেয়ে এক স্তর বেশি। শিশুর ঠান্ডা বা গরম লাগছে কি না বোঝার জন্য হাত-পা নয়, ঘাড় বা বুক ছুঁয়ে দেখুন। আর মনে রাখুন, শীতে ঠান্ডার মতোই বিপজ্জনক হতে পারে অতিরিক্ত গরম, বিশেষ করে ঘুমের সময়।
এক নজরে: কোথায় কী পরাবেন
| পরিস্থিতি | নবজাতক–১২ মাস | ১–৫ বছর |
|---|---|---|
| ঘরের ভেতরে (দিনে) | সুতির বডিস্যুট + ফুলহাতা জামা বা হালকা সোয়েটার + মোজা | সুতির জামা + সোয়েটার বা কার্ডিগান |
| বাইরে (সকাল-সন্ধ্যা) | ওপরের সাথে টুপি, হাতমোজা, বুটি, পাতলা কাঁথা বা জ্যাকেট | জ্যাকেট, টুপি, মোজা |
| রাতে ঘুমের সময় | সুতির বডিস্যুট + ফুলহাতা পায়জামা সেট বা স্লিপস্যুট; টুপি নয় | ফুলহাতা গরম পায়জামা সেট |
| গাড়ি বা রিকশায় | পাতলা স্তর, ওপরে কাঁথা (গাড়ির সিটের বেল্টের নিচে মোটা জ্যাকেট নয়) | জ্যাকেট ও টুপি |
স্তর করার নিয়ম
১. প্রথম স্তর (গায়ে লাগা): নরম সুতির বডিস্যুট বা জামা। ঘাম শুষে নেয়, চুলকায় না। ২. মাঝের স্তর: ফুলহাতা সুতি বা ফ্লানেলের জামা, হালকা সোয়েটার। ৩. বাইরের স্তর (শুধু বাইরে): জ্যাকেট বা মোটা সোয়েটার, যা ঘরে ঢুকলেই খুলে ফেলা যায়। ৪. মাথা, হাত, পা: টুপি, হাতমোজা, মোজা বা বুটি। শিশুর শরীরের তাপ এসব জায়গা দিয়ে দ্রুত বের হয়।
উলের পোশাক অনেক শিশুর ত্বকে চুলকায়; তাই উল সবসময় সুতির ওপরে পরান, সরাসরি গায়ে নয়। প্রথম আলো-র শীতের পোশাক বিষয়ক প্রতিবেদনেও নিচে সুতির স্তর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ঘুমের সময়: অতিরিক্ত গরম এড়ান
AAP-এর নিরাপদ ঘুমের নির্দেশনা অনুযায়ী অতিরিক্ত গরম নবজাতকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই:
- ঘুমের সময় ঘরের ভেতরে টুপি খুলে দিন
- ভারী লেপ, কম্বল বা কাঁথার স্তূপ নয়; বরং শরীরের সাথে মানানসই গরম জামা
- শিশুকে চিত করে, শক্ত-সমতল বিছানায় শোয়ান
- রুম হিটার বা আগুনের কাছে বিছানা নয়
অতিরিক্ত গরমের লক্ষণ: ঘাড় বা পিঠ ঘামে ভেজা, গাল লাল, ঘন শ্বাস, অস্থিরতা, ঘামাচি। এমন হলে এক স্তর কাপড় কমান।
বয়স অনুযায়ী মনে রাখুন
নবজাতক (০–৩ মাস)
নবজাতক নিজের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাই এই সময় সবচেয়ে বেশি যত্ন দরকার। মায়ের বুকের সাথে ত্বকের স্পর্শে রাখা (ক্যাঙারু পদ্ধতি) শিশুকে গরম রাখার চমৎকার উপায়। গোসল দুপুরের উষ্ণ সময়ে, দ্রুত, বন্ধ ঘরে; শীতে প্রতিদিন গোসলের দরকার নেই।
৩–১২ মাস
শিশু হামাগুড়ি শুরু করলে মেঝে ঠান্ডা থাকে; মোজা বা বুটি আর ফুলহাতা পায়জামা দিন। খুব মোটা জামায় নড়াচড়া কঠিন হয়, তাই পাতলা স্তরই ভালো।
১–৫ বছর
এই বয়সে শিশু দৌড়াদৌড়ি করে ঘামে, তারপর ঘাম শুকিয়ে ঠান্ডা লাগে। খেলার সময় একটি স্তর খুলে রাখুন, থামলে আবার পরান। AAP-এর শীতের নিরাপত্তা নির্দেশনাও স্তরে স্তরে পোশাক ও ভেজা কাপড় দ্রুত বদলানোর পরামর্শ দেয়।
শীতের পোশাক কেনার টিপস
- গায়ে লাগা স্তর ১০০% সুতি
- সামনে খোলা বা বড় গলার জামা: মাথা দিয়ে গলাতে হয় না
- ঢিলা বোতাম, লম্বা ফিতা বা খুলে যাওয়া সাজসজ্জা এড়িয়ে চলুন
- এক সাইজ বড় নিন: নিচে স্তর রাখার জায়গা লাগে, আর শিশু শীতের মধ্যেই বড় হয়
- টুপি, হাতমোজা ও মোজার অন্তত দুই সেট রাখুন, একটি ধোয়ার সময় অন্যটি
সাইজ মিলিয়ে নিতে আমাদের সাইজ গাইড দেখুন।
উলের পোশাকের যত্ন
উলের পোশাক হাতে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে সমতলে শুকান; ঝুলিয়ে দিলে টেনে বড় হয়ে যায়। আলমারিতে অনেকদিন রাখা শীতের কাপড় পরানোর আগে ধুয়ে রোদে দিন; জমে থাকা ধুলায় অনেক শিশুর হাঁচি-কাশি হয়।
বাংলাদেশের পরিবারে বাস্তবতা
আমাদের দেশে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের সময় সকাল-সন্ধ্যা অনেক ঠান্ডা থাকে, কিন্তু দুপুরে রোদে বেশ গরম। তাই দিনে কয়েকবার স্তর বদলাতে হয়। অনেক পরিবারে নবজাতককে কয়েক স্তর কাঁথায় মুড়ে রাখা হয়; ঘামে ভিজে গেলে ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি বাড়ে, তাই ঘাড় ছুঁয়ে মাঝে মাঝে দেখুন। কয়লার চুলা বা কাঠের আগুন দিয়ে ঘর গরম করলে ধোঁয়া শিশুর জন্য ক্ষতিকর, আর বন্ধ ঘরে কখনো নয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
শিশুর শরীর ঠান্ডা ও নিস্তেজ লাগা, খেতে না চাওয়া, শ্বাসকষ্ট বা বুকের খাঁচা দেবে যাওয়া, ঘন ঘন শ্বাস, জ্বর (বিশেষ করে ৩ মাসের কম বয়সে), বা ঠোঁট-নখ নীলচে হয়ে যাওয়া: এমন যেকোনো লক্ষণে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
