তেরো থেকে আঠারো মাসে শিশু "বাবু" থেকে "টডলার" হয়ে ওঠে: নিজে হাঁটা, নতুন শব্দ, নিজের ইচ্ছা প্রকাশ ("না!") আর নিজে খাওয়ার জেদ। এই সময়ে শিশুকে নিরাপদে অন্বেষণের সুযোগ দেওয়া, পরিবারের খাবারে অভ্যস্ত করা, আর প্রতিদিন কথা বলা ও বই পড়া সবচেয়ে কাজে দেয়। মাইলস্টোনগুলো গড় হিসাব; নিচের সতর্ক সংকেত মনে রাখুন।
এক নজরে: ১৩–১৮ মাস
| মাস | বিকাশ (সাধারণত) | খাবার | ঘুম |
|---|---|---|---|
| ১৩–১৪ মাস | আসবাব ধরে হাঁটা থেকে প্রথম পা, ১–২টি শব্দ | পরিবারের খাবার নরম করে, কাপে পানি | দিনে ২টি ঘুম |
| ১৫ মাস | কয়েক পা নিজে হাঁটা, আঙুল দিয়ে দেখানো, আদর দেখানো | নিজে আঙুলে খাওয়া, চামচের চেষ্টা | দিনে ১–২টি ঘুম |
| ১৬–১৭ মাস | স্থিরভাবে হাঁটা, সিঁড়িতে হামাগুড়ি দিয়ে ওঠা, নতুন শব্দ | দিনে ৩–৪ বার খাবার + ১–২ নাস্তা | অনেকে দিনে ১টি ঘুমে |
| ১৮ মাস | ধরা ছাড়া হাঁটা, আঁকিবুকি, ৩+ শব্দ, এক ধাপের নির্দেশ বোঝা | ঢাকনা ছাড়া কাপে খাওয়ার চেষ্টা, চামচ | মোট ১১–১৪ ঘণ্টা |
মাসে মাসে কী দেখবেন
১৩–১৪ মাস
অনেক শিশু আসবাব ধরে হাঁটে, কেউ কেউ প্রথম পা ফেলে। "মা", "বাবা" ছাড়াও এক-দুটি শব্দ বলতে পারে। খালি পায়ে নিরাপদ মেঝেতে হাঁটতে দিন; ওয়াকার এড়িয়ে চলুন।
১৫ মাস
কয়েক পা নিজে হাঁটে, কিছু চাইলে আঙুল দিয়ে দেখায়, আদর করে জড়িয়ে ধরে, অন্য শিশুকে দেখে নকল করে। নিজে আঙুলে খাবার তোলে, চামচ ধরতে চায়। সরকারি ইপিআই সূচিতে এই সময়ে (সাধারণত ১৫ মাসে) হাম-রুবেলা টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়; টিকা কার্ড দেখে নিন।
১৬–১৭ মাস
হাঁটা স্থির হয়, সিঁড়িতে হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে চায়, সোফায় চড়ে। নতুন শব্দ যোগ হয়। "না" বলা আর জেদ শুরু হতে পারে; এটা স্বাধীনতার স্বাভাবিক লক্ষণ। ছোট পছন্দ দিন: "লাল কাপ নাকি নীল কাপ?"
১৮ মাস
ধরা ছাড়া হাঁটে, ক্রেয়ন দিয়ে আঁকিবুকি করে, ঢাকনা ছাড়া কাপে খাওয়ার চেষ্টা করে (একটু ফেলবে), "মা/বাবা" ছাড়া অন্তত তিনটি শব্দ বলে, ইশারা ছাড়া "বল নিয়ে এসো" ধরনের এক ধাপের নির্দেশ বোঝে, আর আগ্রহের জিনিস আঙুল দিয়ে দেখায়।
খাবার
WHO-এর পরামর্শ অনুযায়ী:
- বুকের দুধ চালিয়ে যান দুই বছর বা তার বেশি পর্যন্ত।
- দিনে ৩–৪ বার খাবার, প্রয়োজনে ১–২ বার পুষ্টিকর নাস্তা (ফল, ডিম, দই)।
- পরিবারের খাবার: ভাত, ডাল, মাছ, মুরগি, ডিম, সবজি; ঝাল ও লবণ কম করে শিশুর অংশ আলাদা।
- আয়রন: ডিম, কলিজা, মাংস, ডাল, শাক।
- পানি: কাপ বা সিপারে।
এড়িয়ে চলুন: চা-কফি, কোমল পানীয়, চিপস ও প্যাকেটের নাস্তা, বাড়তি চিনি-লবণ; গলায় আটকানোর মতো গোটা বাদাম, গোটা আঙুর, শক্ত চকলেট।
নিজে খাওয়া: শিশুকে নিজে খেতে দিন, নোংরা হবে; সিলিকন বিব আর মেঝেতে পুরোনো চাদর কাজে দেয়। জোর করে খাওয়াবেন না, খাওয়ার সময় মোবাইল-টিভি বন্ধ রাখুন। এই বয়সে খাবারের পরিমাণ দিনে দিনে কম-বেশি হওয়া স্বাভাবিক।
ঘুম
দিনের ঘুমসহ মোট প্রায় ১১–১৪ ঘণ্টা। ১৫–১৮ মাসের মধ্যে অনেক শিশু দুটি দিনের ঘুম থেকে একটিতে আসে, সাধারণত দুপুরে। রাতের রুটিন একই রাখুন: হাত-মুখ ধোয়া, দাঁত মাজা (নরম ব্রাশ, চালের দানার মতো অল্প ফ্লোরাইড পেস্ট), গল্প, ঘুম। WHO ১–২ বছরের শিশুর জন্য ঘুমের নিয়মিত সময় ও দিনে ১৮০ মিনিট শারীরিক নড়াচড়ার কথা বলে।
নিরাপত্তা চেকলিস্ট
- হাঁটা শিশুর জন্য: সিঁড়িতে গেট, বারান্দা ও ছাদের রেলিং পরীক্ষা, জানালার পাশে চেয়ার-খাট নয়
- ওষুধ, কেরোসিন, ব্লিচ, কীটনাশক তালাবদ্ধ উঁচু জায়গায়
- বালতি, ড্রাম, পুকুর: শিশুকে পানির কাছে এক মুহূর্ত একা নয়
- রান্নাঘরে চুলা ও গরম পাত্র নাগালের বাইরে
- টিভি বা ভারী আসবাব দেয়ালে আটকানো
বাংলাদেশের পরিবারে বাস্তবতা
এই বয়সে অনেক পরিবারে শিশুকে খাবারের বদলে বেশি দুধ বা বিস্কুট দেওয়া হয়, এতে খাবারে আগ্রহ কমে ও রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়ে। দুধের পাশাপাশি পরিবারের খাবারকে মূল খাবার বানান। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে পুকুরের কাছে বিশেষ নজর রাখুন; এক থেকে চার বছরের শিশুরা পানিতে ডোবার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
- ১৬ মাসে কোনো শব্দ না বলা
- ১৮ মাসে নিজে না হাঁটা
- আঙুল দিয়ে আগ্রহের জিনিস না দেখানো, নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া
- চোখে চোখ রাখা খুব কম, অন্যদের প্রতি আগ্রহ না থাকা
- ওজন না বাড়া, খুব ফ্যাকাশে দেখানো
- আগে পারা কথা বা দক্ষতা হারিয়ে যাওয়া
- জ্বর, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা, খিঁচুনি: জরুরি
