শিশুর বেশিরভাগ ভয় বয়সের সাথে আসে, আবার বয়সের সাথেই চলে যায়। দুই বছরে অপরিচিত মানুষ, চার বছরে অন্ধকার আর কাল্পনিক দৈত্য, আট বছরে চোর-ডাকাত বা মৃত্যু, কিশোর বয়সে পরীক্ষা ও বন্ধুদের মতামত। বাবা-মায়ের কাজ ভয়কে উড়িয়ে দেওয়া নয়, আবার ভয় থেকে সবসময় আড়াল করাও নয়; অনুভূতি মেনে নিয়ে ছোট ছোট ধাপে সাহস দেখানোর সুযোগ দেওয়া। AAP জানায়, বেশিরভাগ শৈশবের ভয় সাধারণ এবং আশ্বাস ও সমর্থনে কমে যায়।

এক নজরে: কোন বয়সে কোন ভয় স্বাভাবিক

বয়স সাধারণ ভয় যা কাজে দেয়
১–২ বছর অপরিচিত মানুষ, মা-বাবা থেকে আলাদা হওয়া, জোরে শব্দ বিদায় বলে যাওয়া, ফেরার নিশ্চয়তা
৩–৫ বছর অন্ধকার, কাল্পনিক দৈত্য, কুকুর, বিদ্যুৎ চমকানো নাইট লাইট, কল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধান
৬–৮ বছর চোর, আঘাত, একা থাকা, মৃত্যু সহজ সত্য তথ্য, নিরাপত্তার পরিকল্পনা
৯–১২ বছর পরীক্ষা, বন্ধুদের প্রত্যাখ্যান, খবরের দুর্যোগ কথা বলার সময়, খবর ব্যাখ্যা
১৩–১৭ বছর ভবিষ্যৎ, চেহারা, সামাজিক মূল্যায়ন শোনা, বাস্তব পরিকল্পনা, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং

ভয় পেলে কী বলবেন

  • অনুভূতি মেনে নিন। "বাজ পড়ার শব্দে তোমার বুক ধড়ফড় করছে, তাই না? আমি পাশে আছি।"
  • সহজ সত্য তথ্য দিন। "বাজ আকাশে হয়, ঘরের ভেতরে আমরা নিরাপদ।"
  • নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দিন। অন্ধকারে ভয় পেলে শিশুকে নিজেই নাইট লাইট জ্বালাতে দিন।
  • ছোট ধাপ ঠিক করুন। একা ঘুমের ভয় হলে প্রথমে আপনি পাশে বসবেন, তারপর দরজার কাছে, তারপর বাইরে।
  • সাহসের প্রশংসা। "আজ তুমি নিজে বাথরুমে গেলে, যদিও একটু ভয় লাগছিল।"

বয়স অনুযায়ী কী করবেন

১–২ বছর: আলাদা হওয়ার ভয়

মা কাজে গেলে বা চোখের আড়াল হলে কান্না এই বয়সে স্বাভাবিক। লুকিয়ে চলে যাবেন না; এতে ভয় বাড়ে। ছোট করে বিদায় বলুন, একটি নির্দিষ্ট "বিদায় রীতি" রাখুন (চুমু, হাত নাড়া), আর ফিরে এসে বলুন, "দেখো, মা ফিরে এসেছে।"

৩–৫ বছর: কল্পনার দৈত্য

এই বয়সে কল্পনা খুব শক্তিশালী, তাই খাটের নিচের দৈত্য সত্যিই ভয়ের। "দৈত্য বলে কিছু নেই" বলার চেয়ে একসাথে টর্চ নিয়ে দেখুন। ঘুমের আগে শান্ত রুটিন রাখুন, ভয়ের কার্টুন বা ভিডিও বন্ধ রাখুন। একটি নরম খেলনা "পাহারাদার" হতে পারে।

৬–৮ বছর: বাস্তব বিপদের ভয়

শিশু এখন বোঝে যে বিপদ সত্যি হতে পারে: আগুন, চোর, অসুখ, মৃত্যু। প্রশ্নের সহজ ও সৎ উত্তর দিন। নিরাপত্তার পরিকল্পনা একসাথে করুন: হারিয়ে গেলে কাকে বলবে, বাবা-মায়ের ফোন নম্বর মুখস্থ করা। পরিকল্পনা থাকলে ভয় কমে।

৯–১২ বছর: খবর ও পরীক্ষা

বন্যা, দুর্ঘটনা বা সহিংসতার খবর শিশুরা টিভি ও মোবাইলে দেখে। জিজ্ঞেস করুন সে কী শুনেছে, ভুল ধারণা ঠিক করুন, আর বলুন বড়রা কী করছে নিরাপত্তার জন্য। পরীক্ষার ভয়ে প্রস্তুতির পরিকল্পনা ও বিশ্রাম দুটোই দরকার।

১৩–১৭ বছর: ভবিষ্যৎ আর মানুষের মতামত

কিশোরদের ভয় প্রায়ই বাইরে থেকে বোঝা যায় না: ভর্তি পরীক্ষা, চেহারা, সোশ্যাল মিডিয়া। উপদেশের আগে শুনুন। "এগুলো কোনো ব্যাপার না" বলবেন না। প্রয়োজনে স্কুল কাউন্সেলরের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিন।

যা এড়িয়ে চলবেন

  • ভূত, "ছেলেধরা", পুলিশ বা ডাক্তারের ইনজেকশনের ভয় দেখিয়ে কথা শোনানো।
  • ভয় নিয়ে ঠাট্টা করা বা "ভিতু" বলা।
  • ভয়ের সব কিছু থেকে সবসময় সরিয়ে রাখা; তাতে সাহস দেখানোর সুযোগ থাকে না।
  • বড়দের নিজেদের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা শিশুর সামনে প্রকাশ।

বাংলাদেশের পরিবারে বাস্তবতা

আমাদের অনেক পরিবারে শিশুকে ঘুম পাড়াতে বা খাওয়াতে "বুড়ি এসে নিয়ে যাবে" বা ভূতের ভয় দেখানো হয়। এতে রাতের ভয় ও দুঃস্বপ্ন বাড়ে। কাজের সহায়ক ও আত্মীয়দেরও এ বিষয়ে অনুরোধ করুন। লোডশেডিংয়ের অন্ধকার, কালবৈশাখীর ঝড় বা বন্যার খবরে শিশু ভয় পেলে আগে থেকে টর্চ বা চার্জার লাইট শিশুর নাগালে রাখুন।

কখন সাহায্য নেবেন

যদি ভয় সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে স্কুল, ঘুম বা খেলাধুলা ব্যাহত করে, শিশু প্রায়ই পেটব্যথা-বমিভাবের কথা বলে, আতঙ্কের মতো আক্রমণ হয়, বা কোনো দুর্ঘটনা-সহিংসতার পর ভয় না কমে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোবিদের পরামর্শ নিন। UNICEF-এর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শও দেখতে পারেন।

সম্পর্কিত গাইড